ঝালকাঠিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে কয়েকশ হেক্টর জমির ধান, দিশেহারা কৃষক

নিজস্ব সংবাদদাতা, বাংলা কাগজ; আ. রহিম রেজা, ঝালকাঠি : সকাল থেকে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হওয়ায় ছিলো কুয়াশাও। সকাল ৮টা থেকে শুরু হয় গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। সেইসঙ্গে ছিলো বাতাস। ঘণ্টাখানেক এমন অবস্থায় ঝালকাঠি জেলায় আবাদকৃত আমন ধান মাটিতে হেলে পড়েছে।

সন্ধ্যার পূর্বেও এমন আবহাওয়া ছিলো গেলো শনিবার (২১ নভেম্বর)।

এতে ঝালকাঠি জেলার ৪ উপজেলার কয়েকশ হেক্টর জমির আমন ধান মাটিতে হেলে পড়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষক। চরম দুশ্চিন্তা ও হতাশায় সময় পার করছেন কৃষকেরা।

এর আগে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সর্বত্র আমন ধানে খোলপচা ও পাতামোড়ানো রোগ আক্রমণ দেখা দেয়।

ফসল রক্ষায় কীটনাশক দিয়েও তেমন উপকার পাচ্ছেন না কৃষকেরা। সেইসঙ্গে রয়েছে ইদুরের উপদ্রবও।

সবমিলিয়ে ঝালকাঠি জেলার কৃষকেরা এখন আমনের ফলন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।

সদর উপজেলার ছত্রকান্দা, বৈদারাপুর, গাবখান, বেরপাশা, দেউলকাঠি, রাজাপুর উপজেলার নারিকেল বাড়িয়া, শুক্তাগড়, কাঠিপাড়া, পাড়গোপালপুর গ্রামে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে সোমবার (২৩ নভেম্বর) এ অবস্থা জানা গেছে।

রাজাপুর উপজেলার নারিকেল বাড়িয়া গ্রামের কৃষক শাহ আলম খলিফা জানান-একাধিকবার প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে ৩ বিঘা জমিতে আমন ধানের আবাদ করেছেন।

‘প্রতিবারের চেয়ে এ বছর চাষাবাদে খরচও হয়েছে আড়াইগুণ।’

‘এতো অতিরিক্ত খরচ, তারপরেও শেষ সময়ে আমন ধান ভালোই হয়েছিলো। ভালো ফসলের আশায় ধানের জমিতে দেওয়া হয়েছিলো পরিমাণমতো সারও। কিন্তু শনিবার সকালের এবং শেষ বিকেলে গুড়িগুড়ি বৃষ্টির সঙ্গে বাতাস থাকায় ধান মাটিতে হেলে পড়েছে।’

‘সামনে যদি আবহাওয়া খারাপ থাকে, তাহলে সব ধানই চিটা হয়ে যাবে।’

এমন অবস্থায় চরম হতাশায় পড়েছেন কৃষক শাহ আলম খলিফা।

শুক্তাগড় ইউনিয়নের ঘিগড়া গ্রামের কৃষক আক্কাস আলী তালুকদার জানান- নয় কাঠা জমিতে আমনের আবাদ করেছি। বীজের (ধান) চেহারা পরিবর্তনের সঙ্গেসঙ্গে পাতামোড়া ও খোলপচা রোগ দেখা দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

‘মরা ধানের ছোপা ও মোড়ানো পাতার ভেতরে পোকার অসংখ্য সাদা ডিম থেকে ছোট ছোট লম্বাকৃতির পোকা হয়ে ধানের পাতা মরে যাচ্ছিলো।’

‘কৃষি বিভাগ ও দোকানদারের পরামর্শে কীটনাশক ওষুধ স্প্রে করায় পোকার দমন হয়েছে।’

‘কিন্তু এখন গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির সঙ্গে বাতাসের কারণে ধান মাটিতে লুটিয়ে (হেলে) পড়ায় মাথায় যেন ঠাডা (বজ্রপাত) পড়েছে।’

সদর উপজেলার বৈদারাপুর গ্রামের কৃষক চান মিয়া জানান- তিনি দেড় বিঘা জমিতে আমন ধান আবাদ করেছেন।

‘দফায় দফায় বন্যা কাটিয়ে মূল খরচের চেয়ে অতিরিক্ত খরচ করে বীজ ফলাতে অনেক কষ্ট হয়েছে। যখনই বীজ ভালো হয়ে উঠছিলো তখনই ক্ষেতে খোলপচা ও পাতামোড়ানো রোগ দেখা দেয়। উপজেলা কৃষি অফিসে গিয়ে পরামর্শ নিয়ে কীটনাশক স্প্রে করায় কিছুটা পানোজ (চেহারার পরিবর্তন) ফিরছে।’

‘বীজে ধান আসতে শুরু করেছে। এমন সময় গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির সঙ্গে বাতাস হওয়ায় অধিকাংশ ফসলই মাটিতে হেলে পড়েছে। এখন কি করবো বুঝতে পারছি না।’

দেউলকাঠি গ্রামের পরিমল মন্ডল বলেন, ‘৩ বিঘা জমিতে আমন ধানের চাষ করেছি। প্রায় মাসখানেক পূর্বে সার দিয়েছি। বীজ এখন ঘনসবুজ আকৃতির হয়ে ওঠে ধান আসতে শুরু করছে। কয়েকদেিনর মধ্যেই ধানের ছড়ার প্রাথমিক শস্য আসবে। এমন অবস্থায় গুড়িগুড়ি বৃষ্টির সঙ্গে বাতাসের কারণে ধান সব মাটিতে নুয়ে (লুটিয়ে) পড়েছে।’

জানতে চাইলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ফজলুল হক বাংলা কাগজকে বলেন, ‌‘এবার জেলায় ৪৮ হাজার হেক্টর জমিতে আমন আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিলো।’

‘মৌসুমের শুরুতেই কয়েক দফা বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে বীজতলা নষ্ট এবং রোপণকৃত আমনের চারা পচে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছিলো।’

‘চাহিদার চেয়েও এক হাজার হেক্টরে অতিরিক্ত বীজতলা এবং ১২০টি বেডে ভাসমান বীজতলা করায় বীজের সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছি। কোনও কোনও এলাকায় খোলপচা ও পাতামোড়ানো রোগ স্বল্পাকারে দেখা দিয়েছিলো, তা প্রতিরোধে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিকার হয়েছে। শনিবারের (২১ নভেম্বর) গুড়িগুড়ি বৃষ্টির সঙ্গে বাতাস হওয়ায় ধান মাটিতে হেলে পড়েছে। এরপর যদি ভারী বর্ষণ এবং পানি বৃদ্ধি না হয়, তাহলে ধানের ক্ষতি কম হবে। আর যদি আবহাওয়া খারাপ হয়, তাহলে সব ধানই চিটা হয়ে যাবে। এ অবস্থায় যদি প্রণোদনা আসে তাহলে সুষম বণ্টন করে দেওয়া হবে।’

পোকায় ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বাংলা কাগজকে কোনও সদুত্তর দিতে পারেন নি।

এ বিষয়ক : পাইকগাছায় আমনের বাম্পার ফলন; কৃষকের মুখে হাঁসি

Facebook Comments Box

Leave a Reply

Your email address will not be published.