মাইন্ড এইড বন্ধ হলেও একই ধরনের নিরাময়কেন্দ্র বন্ধ কবে!

নিজস্ব প্রতিবেদন, বাংলা কাগজ : জ্যেষ্ঠ সহকারি পুলিশ সুপার আনিসুল করিম নির্যাতনে মারা যাওয়ার পর ঢাকার আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতাল বন্ধ করা হলেও একই অভিযোগ রয়েছে এই ধরনের অনেক নিরাময় কেন্দ্রের বিরুদ্ধেও।

মাইন্ড এইডের ঘটনাটি আলোচনায় ওঠার পর বিভিন্ন মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র এবং মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া বেশ কয়েকজনের কাছে বাংলা কাগজ অভিজ্ঞতা শুনতে চাইলে তাঁরা মারধরের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। এরমধ্যে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধেই অভিযোগ বেশি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসেবে সারাদেশে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যা সরকারি চারটিসহ মোট ৩৫৫টি। এরমধ্যে ১৫৫টি ঢাকায়।

অনেক মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র একইসঙ্গে মানসিক রোগীদের চিকিৎসাও দেয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে বৈধ মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রের সংখ্যা ১৫টি।

আদাবর থানার পাশের মাইন্ড এইড হাসপাতালটি মানসিক রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র হিসেবেও কাজ চালাচ্ছিল, যদিও তাঁদের হাসপাতালের অনুমোদনই ছিল না।

গত ৯ নভেম্বর মাইন্ড এইড হাসপাতালে মানসিক রোগের চিকিৎসা নিতে গিয়ে মারধরের শিকার হয়ে মারা যান এএসপি আনিসুল করিম।

ঘটনার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আনিসুলকে ৬ থেকে ৭ জন মাটিতে ফেলে চেপে ধরে আছেন, দু’জন তাঁকে কনুই দিয়ে আঘাত করছেন।

মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র কিংবা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন, এমন কয়েকজন আনিসুল করিমের মতো ভর্তির দিন থেকেই নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানান।

ঢাকার একটি বেসরকারি মনোরোগ চিকিৎসা কেন্দ্রে নার্সের হাতে নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন এক নারী।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ওই নারী বলেন, দ্বিতীয় সন্তান জন্মের পর পোস্ট পার্টাম সাইকোসিসে (সন্তান জন্মের আগে বা পরের মানসিক সমস্যা) আক্রান্ত হয়ে ওই হাসপাতালে টানা ১০ দিন চিকিৎসা নেন তিনি।

হাসপাতালের চিকিৎসা নিয়ে তাঁর কোনও অভিযোগ না থাকলেও সেখানকার নার্সের হাত মার খেয়েছিলেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় সন্তান জন্মের ১৫/২০ দিন পরের ঘটনা…সেলাইয়ের ব্যথা যায় নি, কিন্তু ওর কথা আমি ভুলে গিয়েছিলাম। আমার শুধু মনে ছিল প্রথম বাচ্চার কথা। হাসপাতালে অবাক হয়ে ভাবতাম আমার সেই বাচ্চাটা কোথায়?’

‘রাত জেগে জেগে এই ঘর ওই ঘর খুঁজতাম। কোথায় আছি, কেন আছি কিচ্ছু বুঝতে পারতাম না। রাতে হাসপাতালের সব লাইট নেভানো থাকলেও নার্সের ঘরে আলো জ্বলত। আমি বারবার ঘুরে ঘুরে ওই ঘরে চলে যেতাম, আমার বাচ্চাটাকে খুঁজতে। তখনই বিরক্ত হয়ে একদিন গায়ে হাত তুলেছিল নার্স।’

‘গালে কালশিটে দাগ ছিল ছাড়া পাওয়ার পরেও। হাসপাতালে প্রথম দিন থেকেই ইনজেকশন দিতে চাইতাম না, হাত পা ছুড়তাম, তখন জোর করে চেপে ধরত নিয়মিতই, সেটাকে মার হিসেবে মনে রাখিনি। কিন্তু ওই ঘটনা মনে রেখেছি, পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে না পারলেও অপমানটা ঠিকই আঘাত করেছে।’

মানসিক রোগীদের নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন বলে শান্ত করার পথ হিসেবে দৈহিক নির্যাতনকে বেছে নেওয়ার বিষয়টি প্রচলিত ছিল, যদিও এখন চিকিৎসকরা বলছেন, কোনোভাবেই শারীরিক নির্যাতন চালানো যাবে না।

ঢাকার মোহাম্মদপুরের এক তরুণ মিরপুরের একটি মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি হয়েছিলেন দুই মাস আগে। তার ভাষ্য, চিকিৎসা সঠিক না দিলেও মারধর নিয়মিতই চলতো।

‘ডাক্তার দেখাত এক মাস-দেড় মাস পরে। খাওয়া-দাওয়া খারাপ ছিল না। কিন্তু কেউ একটু উল্টাপাল্টা করলেই স্টাফরা মারধর করতো, চড়-থাপ্পড় মারত। হাতের কাছে যাই থাকত তাই দিয়ে মারত। খাটের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতো।’

রাজধানীর উত্তরার একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা নেওয়া রনি নামে এক তরুণও একই অভিজ্ঞতার কথা জানান।

‘কী আর চিকিৎসা। থাকা খাওয়া, নানা কাজকর্ম। আর ভুলটুল হলে মারধর করত। লাঠিসহ সামনে যা পায় তাই দিয়া মারে।’

হাসান আরিফ নামে একজন অভিযোগ করেন, আদাবরের নিউ লাইফ মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তির সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে পেটানো হয়েছিলো।

এ বিষয়ক : বন্ধ হলো মাইন্ড এইড হাসপাতাল, এক মালিক গ্রেপ্তার

Facebook Comments Box

Leave a Reply

Your email address will not be published.