ডিসেম্বর ৫, ২০২১

The Bangla Kagoj

বিশ্বের সব দেশে, সব ভাষায়, সব সময় । বাংলা কাগজ । আপনার কাগজ । banglakagoj.net (আমাদের কোনও জাতীয় পত্রিকা নেই)।

স্বামীর টুইট, ভারতীয় মায়ের সন্তান কমলা দেবী হ্যারিস দক্ষিণ এশিয়ার মুখ উজ্জ্বল করলেন

নিজস্ব প্রতিবেদন, বাংলা কাগজ : ‘আমরাও (দক্ষিণ এশিয়া) যে পারি- সেটিই দেখিয়ে দিলেন, ভারতীয় মায়ের সন্তান কমলা দেবী হ্যারিস’- এমন মন্তব্য এখন এপার-ওপার বাংলার। দেশ দুটোর গণমাধ্যম এখন ভাসছে কমলা দেবীর জয়ের আনন্দে।

কারণ ভারতীয় বংশোদ্ভূত শ্যামলা গোপালানের গর্ভেই জন্ম নিয়েছেন কমলা দেবী হ্যারিস। যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। হয়েছেন দেশটির প্রথম অশেতাঙ্গ ভাইস প্রেসিডেন্টও।

কমলা দেবী হ্যারিসের জয়ে আনন্দে উদ্বেলিত দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশও। কারণ এ অঞ্চলের মধ্যে তিনিই প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমন পদে যেতে পেরেছেন।

পাশাপাশি আনন্দে ভাসছে কমলা দেবী হ্যারিসের বাবা ডনাল্ড হ্যারিসের দেশ- জ্যামাইকাও। পৃথিবীর অন্যতম সবচেয়ে সুখী এ দেশের মানুষের যেন আনন্দের সীমা নেই।

আবার কমলা দেবী হ্যারিসের জয়ে শেতাঙ্গ-অশেতাঙ্গ মার্কিনিদের মনে যেমন উল্লাস এসেছে, তেমনি তাঁর জয়ে নিজেকে গর্বিত বলেছেন তাঁরই স্বামী ডগলাস এমহফ।

কমলা দেবী হ্যারিসের নামের ঐতিহ্য : ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে মিল রেখে সৌভাগ্য, সৌন্দর্য আর শক্তির দেবী লক্ষ্মীর প্রতীক আর সংস্কৃত শব্দ ‘কমল’ বা পদ্মফুলের সমার্থক শব্দে মেয়ের নাম ‘কমলা’ রাখেন তাঁর মা শ্যামলা গোপালান। আর দ্বিতীয় অংশ আসে তাঁর বাবার শেষাংশ থেকে।

মেধার জোর : আর কমলা হ্যারিসই বাগ্মিতা, যুক্তি আর ক্ষুরধার বুদ্ধির জোরে ডেমোক্রেটিক পার্টি ও তাঁদের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জো বাইডেনের নির্বাচনী প্রচারে আনেন দারুণ গতি।

৫৫ বছর বয়সি ক্যালিফোর্নিয়ার এ সিনেটর শুরুতে অবশ্য বাইডেনের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। দু’জনেই লড়েছিলেন দলীয় মনোনয়ন পেতে। ওই দৌড়ে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিলো কমলা হ্যারিসের।

তবে পরে অবশ্য বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয় নি তাঁকে।

এ বছর আগস্টেই কমলা হ্যারিস পেয়ে যান প্রথম অশেতাঙ্গ নারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কোনও বড় দলের হয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার টিকিট।

দীর্ঘ কর্মজীবনে অনেকগুলো ‘প্রথমের’ জন্ম দেওয়া এ নারীই এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে গড়েছেন নতুন এক ইতিহাস।

২০১৬ সালে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের প্রবেশের বছরই ক্যাপিটল হিলে হ্যারিসের সদম্ভ পদচারণার শুরু।

ভারতীয় মা ও অশেতাঙ্গ বাবা : কমলা হ্যারিসের বাবা ডনাল্ড হ্যারিস জ্যামাইকান। বেশ মেধাবী (এরই অংশ হিসেবে মার্কসীয় ঘরানার অর্থনীতিতে বেশ দখল থাকা) এ অধ্যাপক এক সময় স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়িয়েছেন।

হ্যারিসের মা ক্যান্সার গবেষক শ্যামলা গোপালান, ভারতীয় এক কূটনীতিকের মেয়ে।

কমলা হ্যারিস তাঁর আত্মজীবনী ‘দ্য ট্রুথস উই হোল্ড: অ্যান আমেরিকান জার্নি’তে বলেছেন- বার্কলেতে নাগরিক অধিকার আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে একে অপরের (তাঁর বাবা-মা) প্রেমে পড়ে যান।

জ্যামাইকার এক জোতদার পরিবারে বাবার দিককার এক দাদীর কাছে বেড়ে ওঠা ডনাল্ড হ্যারিস যুক্তরাষ্ট্রে বার্কলের ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটিতে পড়তে যান ১৯৬১ সালে।

ওখানেই তাঁর পরিচয় হয় শ্যামলার সঙ্গে। এরপর প্রেম, সংসার।

কমলা দেবী হ্যারিস এই দম্পতির প্রথম সন্তান। তাঁর জন্ম ওকল্যান্ডে, ১৯৬৪ সালের ২০ অক্টোবর। কমলার নামের শেষাংশ বাবার কাছ থেকে নেওয়া; প্রথমটুকু মায়ের দেওয়া।

ওই সময় ডনাল্ড হ্যারিস আর শ্যামলা নাগরিক অধিকার আন্দোলনে এতোটাই নিবেদিত ছিলেন যে, এলাকার প্রায় সব প্রতিবাদ কর্মসূচিতেই তাঁদের দেখা মিলতো।

শৈশব ও বেড়ে ওঠা : কমলা দেবী হ্যারিসের ৭ বছর বয়সে তাঁর বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। এরপর দুই মেয়েকে নিয়ে শ্যামলার সংগ্রামী জীবন শুরু হয় বার্কলের একটি হলুদ ডুপ্লেক্স ভবনের ওপরের তলায়।

মেয়েরা যেনও নিজেদের শেকড় ভুলে না যান, সেদিকে ছিল ভারতীয় এ নারীর (শ্যামলা) তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। মায়ের কারণেই শৈশবে অশেতাঙ্গদের জন্য বানানো ব্যাপটিস্ট চার্চ এবং হিন্দু মন্দির দুই জায়গাতেই তাঁর দুই মেয়ের যাতায়াত ছিল নিয়মিত।

কমলা দেবী হ্যারিস তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘মা ভালো করেই বুঝেছিলেন যে, তিনি দুটো অশেতাঙ্গ কন্যাকে বড় করছেন। তিনি জানতেন, তাঁর বেছে নেওয়া দেশ (যুক্তরাষ্ট্র) মায়া ও আমাকে অশেতাঙ্গ হিসেবেই দেখবে। আমরা যেনও আত্মবিশ্বাসী, গর্বিত অশেতাঙ্গ নারী হিসেবে বেড়ে উঠি; তা নিশ্চিত করতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন।’

কমলা দেবী হ্যারিস তাঁর আত্মজীবনী ‘দ্য ট্রুথস উই হোল্ড : অ্যান আমেরিকান জার্নি’তে আরও জানিয়েছেন- তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রামী নানার যথেষ্ট প্রভাব ছিল কমলার ওপর। কারণ তিনি বাল্যকালে ভারতে বেড়াতে গিয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন

উল্লেখ করা যেতে পারে- কমলা দেবী হ্যারিসের জয় কামনা করে ভারতের তামিলনাড়ুতে তাঁর নানার গ্রামে ভোটের সময় পূজোও হয়েছে।

উদীয়মান তারকা : যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি পড়ার পর হ্যারিস হেস্টিং কলেজ থেকে আইনে ডিগ্রি নেন। ১৯৯০ সালে তিনি ওকল্যান্ডে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর ২০০৪ সালে সান ফ্রান্সিসকোর ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি হন।

২০১০ সালে সামান্য ব্যবধানে জয়ী হয়ে হন ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনিই প্রথম নারী ও প্রথম অশেতাঙ্গ-মার্কিনি।

এর দুই বছরের মাথায় ২০১২ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে বারাক ওবামাকে প্রার্থী করা ডেমোক্রেটিক পার্টির ন্যাশনাল কনভেনশনে অসাধারণ বক্তব্য দিয়ে দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের ঢের নজর কাড়েন কমলা দেবী হ্যারিস।

অবশ্য ওবামার সঙ্গে হ্যারিসের সখ্য ছিলো বেশ পুরোনো। ২০০৪ সালে ওবামা সিনেটর হওয়ার আগে থেকেই একে অপরের পরিচিত ছিলেন তাঁরা। ২০০৮ সালে ওবামা প্রেসিডেন্ট পদের মনোনয়ন দৌড়ে নামলে তাঁকে সমর্থন দেওয়া সরকারি পদধারী ব্যক্তিদের তালিকায়ও কমলা দেবী হ্যারিস ছিলেন প্রথম।

২০১৪ সালে আইনজীবী ডগলাস এমহফের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন কমলা দেবী হ্যারিস। এর দুই বছর পর সিনেট নির্বাচনে সহজে জয়লাভ করে তিনি পা রাখেন যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের উচ্চকক্ষে।

প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত, আফ্রিকান-আমেরিকানদের মধ্যে দ্বিতীয় মার্কিন সিনেটর হওয়ার আগে নির্বাচনি প্রচারণায় হ্যারিস অভিবাসন ও বিচার প্রক্রিয়ার সংস্কার, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি ও নারীর প্রজনন অধিকার নিয়ে ছিলেন ব্যাপক সোচ্চার।

সিনেটের সিলেক্ট কমিটি অন ইন্টেলিজেন্ট ও জুডিসিয়ারি কমিটির সদস্য কমলা দেবী হ্যারিস কংগ্রেসের বিভিন্ন শুনানিতে ধারালো ও বুদ্ধিদীপ্ত জিজ্ঞাসাবাদের জন্যও দ্রুত খ্যাতি অর্জন করেন।

২০১৭ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল জেফ সেশনস এবং পরে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হিসেবে ব্রেট কাভানহ’র শুনানিতে তাঁর জিজ্ঞাসাবাদের ধরণ দলের ভেতরে-বাইরে তুমুল প্রশংসা অর্জন করে।

প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে রানিংমেট : ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে আত্মজীবনীমূলক বই ‘দ্য ট্রুথস উই হোল্ড : অ্যান আমেরিকান জার্নি’ প্রকাশিত হওয়ার কিছুদিন পরই হ্যারিস ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেট দলের প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

মনোনয়ন লড়াইয়ের শুরুর দিকে কমলা দেবী হ্যারিসকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ভারমন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এবং ম্যাসাচুসেটসের সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেনের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বি মনে করা হয়েছিলো।

এক বিতর্কে বাইডেনকে অতীতের নেওয়া বেশ কিছু সিদ্ধান্ত এবং সম্প্রদায়গত বিভিন্ন ইস্যুতে নাজেহাল করেও ছেড়েছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই নারী।

ডিসেম্বরে ডেমোক্র্যাট দলের লড়াই থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নেন কমলা দেবী হ্যারিস।

মনোনয়ন লড়াই থেকে ছিটকে পড়ার পর চলতি বছরের মার্চে কমলা দেবী হ্যারিস বাইডেনকে সমর্থন দিয়ে বলেন, ‘তাঁকে (বাইডেন) যুক্তরাষ্ট্রের পরের প্রেসিডেন্ট করতে সাধ্যের সবটাই করবো।’

মে মাসে মিনিয়াপোলিসে পুলিশি হেফাজতে অশেতাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর থেকে ডেমোক্র্যাট ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে কমলা দেবী হ্যারিসের নাম সামনের দিকে চলে আসে। ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর যুক্তরাষ্ট্রের যে কয়জন রাজনীতিক সমাজ ও বিচারব্যবস্থায় সংস্কারের দাবিতে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন, কমলা দেবী হ্যারিস ছিলেন তাঁদের একজন।

অবশেষে গত ১১ আগস্ট কমলা দেবী হ্যারিসকেই নির্বাচনি জুটি হিসেবে বেছে নেন জো বাইডেন।

রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি : অভিবাসন, জলবায়ু পরিবর্তন, গর্ভপাত, সবেতনে ছুটি, সমকামীদের অধিকার, শিক্ষায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়ানো, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, আবাসন ও কর ব্যবস্থাপনা সংস্কারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে কমলা দেবী হ্যারিস ডেমোক্র্যাট মধ্যপন্থি ও প্রগতিশীলদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন।

কমলা দেবী হ্যারিস ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের একনিষ্ঠ সমর্থক। ২০১৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির এক সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, ‘ইসরায়েলের নিরাপত্তা এবং তাঁদের আত্মরক্ষার অধিকারের প্রশ্নে ব্যাপক সমর্থন জোগাড়ে আমার ক্ষমতার মধ্যে যা যা থাকবে, এর সবটাই আমি করবো।’

মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে থাকার পাশাপাশি কমলা দেবী হ্যারিস বিভিন্ন সময়ে পুলিশ নীতিতে বদল আনারও দাবি তুলেছেন।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত এ নারীর বাগ্মিতা, অভিবাসী শেকড়, অশেতাঙ্গ সংস্কৃতি এবং অ্যাটর্নি ও সিনেটর হিসেবে অভিজ্ঞতা দিয়ে ডেমোক্র্যাটরা যুক্তরাষ্ট্রে বিভাজনের রাজনীতির ইতি টানার স্বপ্ন দেখছেন।

কমলা দেবী হ্যারিসের স্বামীর টুইট : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় কমলা দেবী হ্যারিসের জন্য নিজেকে গর্বিত মন্তব্য করে টুইট করেছেন তাঁরই স্বামী ডগলাস এমহফ।

তিনি বলেন, ‘তোমার জন্য খুবই গর্বিত।’

(সূত্র : বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, নিউজ১৮ বাংলা, ব্রিটানিকা ডটকম, পলিটিকো ডটকম ও বিজনেস ইনসাইডার।)

এ বিষয়ক : ইতিহাসের প্রথম মার্কিন নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট

Facebook Comments Box
Contact us

বাংলা কাগজ এ আপনাকে স্বাগতম।

X
Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial
Facebook91m
Twitter38m
LinkedIn4m
LinkedIn
Share