আগস্ট ১, ২০২১

The Bangla Kagoj

আপনার কাগজ । banglakagoj.net

মিরপুরে ‘চোখ খুললেই’ ইয়াবা

নিজস্ব প্রতিবেদন, বাংলা কাগজ : মিরপুর ১০ নম্বর থেকে কিছুটা এগোলে হাতের ডানদিকে চওড়া রাস্তা। স্থানীয়ভাবে ক্যাম্পের গলি নামে পরিচিত। রাস্তার দুই পাশে কুড়ি-পঁচিশেক সুদৃশ্য বহুতল ভবন পেরিয়ে একটা ফটক। ফটকের একপাশে বাঙালি, অন্যপাশে বিহারিরা। প্রতি সন্ধ্যায় এই ফটকের দুই পাশে জমে ওঠে মাদকের বাজার।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত ৮টার দিকে সেখানে গিয়ে ফটকের দুই পাশ থেকেই এই ‘বাজার’ দেখা গেল। মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে একের পর এক ফাঁকা রিকশা, সিএনজি চালিত অটো রিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি এসে চওড়া রাস্তার ওপরে সারি বেঁধে দাঁড়াচ্ছিল। এই চালকদের ‘স্বাগত’ জানাতে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল অল্পবয়স্ক কিশোর-তরুণেরা। চালক এসে দাঁড়ালেই তারা ফটকের ওপাশ থেকে ইয়াবা এনে দিচ্ছিল। টাকা শোধ করে যাত্রীবিহীন এই বাহনগুলো যেভাবে এলাকায় ঢুকছিল, বেরিয়ে যাচ্ছিল সেই একইভাবে। এটা মাদকের পাইকারি ব্যবসা। আর ক্যাম্পের ভেতরে চলে খুচরো কেনাকাটা।

এলাকার পুরোনো বাসিন্দারা বললেন- আগে ক্যাম্পের গলিঘুপচিতে ইয়াবার কেনাবেচা ছিল। এখন বাজার বড় সড়কের ওপর। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিয়ের শাড়ি ও লেহেঙ্গা আমদানিকারক এক ব্যক্তি বাংলা কাগজকে বলেন- আদতে তিনি ঢাকাইয়া। ষাটের দশক থেকে মিরপুরে আছেন। বাড়িঘর করেছেন ঠিকই, সপরিবারে এখানে থাকাটাই এখন কষ্টকর হয়ে গেছে। সন্ধ্যা নামলেই মাদকের কেনাবেচা শুরু হয়। হই-হুল্লোড়ে টেকা যায় না। ওই ব্যক্তি ছাড়াও আশপাশের ভবনের বাসিন্দাদের একই অবস্থা। তাঁরাও এই ইয়াবার বাজার নিয়ে অস্বস্তিতে আছেন। অনেকে বাসার ভেতর থেকে ইয়াবা কেনাবেচার ছবি ও ভিডিও ধারণ করেছেন। বাংলা কাগজকে সেগুলো দেখিয়েছেন। সম্প্রতি এলাকায় বাড়ির মালিকেরা ১২টি ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা বসিয়েছেন।

বিহারি ক্যাম্পের একজন বাসিন্দা বাংলা কাগজকে বলেন- তাঁদের এলাকায় মমতাজ নামে এক ব্যক্তির চৌদ্দ বছরের ছেলেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। ছেলেটির পরিবার থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেছিল। পরে জানতে পারে ছেলেটি চট্টগ্রাম থেকে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছে। তার সঙ্গে আরও দুই সহযোগী গ্রেপ্তার হয়েছে, দুজনই বাঙালি। তারা এখন আছে টঙ্গীর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে।

এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা মাদকের খুচরো কেনাকাটার জায়গাগুলোও ঘুরে দেখালেন। রব্বানী হোটেলকে পেছনে রেখে এগোতেই ইমামবাড়া মাঠ, চার নম্বর বিল্ডিং এলাকার আশপাশে খুচরা বিক্রেতা ও মাদকসেবীদের দেখা যায়।

কবে থেকে এই পরিস্থিতি, কারা জড়িত? এমন প্রশ্নে বাঙালি বা বিহারি কেউ নিজেদের নাম প্রকাশ করে সংবাদপত্রের সঙ্গে কথা বলতে চান নি। তবে তাঁরা জানান, এখানে যে ইয়াবার প্রকাশ্য বেচাকেনা চলে তা স্থানীয় কাউন্সিলর কাজী জহিরুল ইসলাম (মানিক) জানেন। মিরপুরের ইয়াবার কারবার যারা করেন সবাই কাউন্সিলরের ঘনিষ্ঠ।

স্থানীয়ভাবে সমস্যার সমাধান করতে না পেরে বিহারি জনগোষ্ঠীর একাংশ কিছুদিন আগে বাঙালিদের কাছে চিঠি দিয়েছেন। মাদকের বিরুদ্ধে আমজনতার বার্তা নামে বাংলায় লেখা ওই চিঠিতে তাঁরা রাজীবকে ‘কিং রাজীব’ বলে উল্লেখ করেছেন।

বিজ্ঞাপন

তাঁরা লিখেছেন, রাজীবের ঘনিষ্ঠ সহযোগী বিহারি ক্যাম্পের আবরার আহমেদ খান। রাত ৯ টা থেকে রাত ২/৩ টা পর্যন্ত প্রতিদিন এলাকায় মাদকের জমজমাট আসর বসে। মাদক বেচাকেনায় ঝামেলা হয়েছে কিনা, কার জন্য সমস্যা হচ্ছে, কেউ ধরা পড়েছে কি না, কাউকে ছাড়াতে হবে কি না এসব নিয়ে বিচার সালিস করেন আবরার।

বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দাদের অভিযোগ এর আগে অনেকবার তাঁরা মাদক প্রতিরোধের চেষ্টা করেছেন। তাঁরা বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চিঠি দিয়েছেন, মাদক প্রতিরোধ কমিটি করেছেন। থানায় লিখিত অভিযোগ জানানোর পর ওই অভিযোগের কপি আবরার আহমেদ খানের হাতে পড়ে। এরপর আরও বেপরোয়া আচরণ করছে আববার। ওই চিঠিতে বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দারা পুলিশের সোর্স, দুই নারীসহ আরও পাঁচ-ছয়জনের নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁরা এলাকার প্রভাবশালী বাঙালিদের এই কয়জনের ব্যাপারে পুলিশকে অভিযোগ করার অনুরোধ করেছে।

আবরার আহমেদ খান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বাংলা কাগজের কাছে দাবি করেন- তিনি নিজের খেয়ে বিহারিদের সেবা করেন। তারপরও একদল লোক তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। তাঁর ঘনিষ্ঠ সঙ্গী কোরবানকেও পূর্ব শত্রুতার জেরে ফাঁসানোর চেষ্টা হচ্ছে বলে দাবি করেন। তবে এলাকায় মাদকের ছড়াছড়ির কথা স্বীকার করেছেন তিনি।

এই এলাকার পুরোনো এক বাসিন্দা বাংলা কাগজকে বলেন- তাঁর বাসার সামনের ল্যাম্পপোস্টের নিচে ইয়াবার কেনাবেচা হয়। ল্যাম্পপোস্ট নষ্ট হয়ে আছে অনেক দিন। তিনি বহুবার কাউন্সিলরকে বলেছেন। প্রতিবারই তিনি ল্যাম্পপোস্ট সারিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তারপর আর কিছু করেননি। জানতে চাইলে কাজী জহিরুল ইসলাম বাংলা কাগজকে বলেন, তাঁরা কাউন্সেলিং করছেন। নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। মাদক কারবারীদের সঙ্গে তাঁর সখ্যের অভিযোগ মিথ্যে। তাঁর এলাকায় সব ল্যাম্পপোস্ট সচল আছে বলেও দাবি করেন। তারপরও তাঁর এলাকায় প্রকাশ্যে কি করে মাদক কেনাবেচা হচ্ছে, জানতে চাইলে বলেন, মাদকের কেনাবেচা আসলে একটু বেড়েছে। করোনার জন্য তিনি কিছু করতে পারছেন না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- এর আগে মহররমের সময় বিহারি ক্যাম্পে শাহিদ নামে একজন খুন হন। এর আগে ২০১৮ সালে মাদককে কেন্দ্র করে খুন হয় পরপর তিনটি। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, এডিসি ক্যাম্প, মিল্লাত ক্যাম্প, রহমত ক্যাম্প, মুসলিম ক্যাম্প, থার্টিনাস ক্যাম্প, কুর্মিটোলা ক্যাম্প এলাকায় মাদকের বেচাকেনা হয়। মূলত মোহাম্মদপুর, আবদুল্লাহপুর ও টঙ্গী থেকে মাদক এনে পল্লবীতে বিক্রি করা হতো। এখন কক্সবাজার থেকে সরাসরি ইয়াবা এসে ঢুকছে বিহারি ক্যাম্পে। সপ্তাহ তিনেক আগে পল্লবী থানার নতুন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী ওয়াজেদ আলী ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন।

তিনিও স্বীকার করেন ইয়াবার প্রকোপ এলাকায় বেড়েছে।

জানতে চাইলে কাজী ওয়াজেদ আলী বাংলা কাগজকে বলেন- প্রস্তুতি নিয়ে অভিযানে নামবো। এর আগে যখনই পুলিশ অভিযান করেছে, অনেকবারই আসামিদের ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এবার আর সেটি হতে দেওয়া হবে না।

এ বিষয়ক : ডিএমপির মাদক বিরোধী অভিযান, ৪৭ মামলা, গ্রেপ্তার ৭৫

Facebook Comments Box
Call Now ButtonContact us

বাংলা কাগজ এ আপনাকে স্বাগতম।

X
Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial
Facebook91m
Twitter38m
LinkedIn4m
LinkedIn
Share