সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২১

The Bangla Kagoj

আপনার কাগজ । banglakagoj.net

ব্যাংক জালিয়াত-১ : অর্থ পাচার ও লুটপাট নিয়েই ছিলেন রূপালী ব্যাংকের সাবেক এমডি!

নিজস্ব প্রতিবেদন, বাংলা কাগজ : অর্থ পাচার আর লুটপাট নিয়েই ছিলেন রূপালী ব্যাংকের সাবেক এমডি এম ফরিদ উদ্দিন। তার নামে রয়েছে নানান অভিযোগ। এক্ষেত্রে তিনি সংশ্লিষ্টদের ‘ম্যানেজ’ করার মাধ্যমে তার দুর্নীতির ডালপালা সবক্ষেত্রেই ছড়িয়েছেন বলেই অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি এম ফরিদ উদ্দিনকে ব্যাংক খাতে সংশ্লিষ্টরা ‘৬ পারসেন্ট’ হিসেবেই জানেন। অর্থাৎ যে কোনও ঋণের ক্ষেত্রে এম ফরিদ উদ্দিনকে দিতে হতো ৬ পারসেন্ট ঘুষ।

সূত্র জানায়, অবৈধভাবে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে এম ফরিদ উদ্দিনের কোনও জুড়ি নেই। তিনি ৬ শতাংশ ঘুষ গ্রহণ করে যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ প্রদান করেছেন অনেক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প গ্রুপকে। এমনকি তাঁর আমলে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানও পেয়েছে বিপুল পরিমাণে অর্থ। ফলে ক্ষতির মুখে পড়েছে রূপালী ব্যাংক।

সুত্রমতে- এম ফরিদ উদ্দিনের আমলেই ফেনীর এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে কোনও ধরনের বাছবিচার ছাড়াই ১৫১ কোটি টাকার ঋণসুবিধা দেয় রূপালী ব্যাংক। এর মধ্যে ৬০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন দেয় ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ। বাকি ঋণের মধ্যে ৭৩ কোটি টাকা দেওয়া হয় কোনও ধরনের অনুমোদন ছাড়াই। পরে এর কোনও নথিও পরে খুঁজে পাওয়া যায় নি।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে আরও জানা গেছে- এম ফরিদ উদ্দিন রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) থাকাকালীন প্রয়োজনীয় ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ১৬টি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ পুনর্গঠনের সুবিধা দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে প্রায় ১ হাজার ৩৩২ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করা হয়। যাতে বিপুল অঙ্কের ক্ষতির মুখে পড়ে রূপালী ব্যাংক।

জানা গেছে- ওইক্ষেত্রে ১০টি প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া হয় নামমাত্র ডাউন পেমেন্ট। বাকি ৬টি প্রতিষ্ঠানকে ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়। ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় এক বছর সময়ে বিপুল ওই ঋণ পুনর্গঠন করা হয়। ওই সময় রূপালী ব্যাংকের এমডির দায়িত্বে ছিলেন এম ফরিদ ‍উদ্দিন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী- ঋণ পুনর্গঠন করতে হলে সংশ্লিষ্ট ঋণের সর্বনিন্ম ৫ থেকে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ডাউন পেমেন্ট হিসেবে জমা রাখতে হয়। এক্ষেত্রে প্রথমবার ৫ শতাংশ, দ্বিতীয়বার ১০ শতাংশ ও তৃতীয়বার ১৫ শতাংশ জমা রাখার বিধান রয়েছে। এটি কার্যকর হয় ধাপে ধাপে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী- নিয়ম ভেঙে ঋণ পুনর্গঠন করে ১৬টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় সাড়ে ১৩শ’ কোটি টাকা। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঢাকায় ১০টি, চট্টগ্রামে ১টি, বরিশালে ১টি, খুলনায় ১টি ও রংপুরের ৩টি। এর মধ্যে ৬টি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনও ডাউন পেমেন্ট নেয়নি। এগুলো হল- রূপালী ব্যাংক ঢাকার স্থানীয় কার্যালয়ের গ্রাহক মাদার টেক্সটাইলের ৬৩৪ কোটি টাকা, বায়োনিক সি ফুড এক্সপোর্টের ২৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা, মেসার্স বিজিসি ট্রাস্ট মেডিকেল কলেজের ১১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা, মেসার্স বদর স্পিনিং মিলসের ১৯৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, মেসার্স বাইপেড সুয়েটার্সের ১৬ কোটি ২ লাখ টাকা এবং মেসার্স বিউটিফুল জ্যাকেটস’র ১১ কোটি ১৬ লাখ টাকা।

অপরদিকে শুধু নামমাত্র ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনর্গঠন করা হয় বাকি ১১টি প্রতিষ্ঠানের। এগুলো হল- রূপালী ব্যাংকের ঢাকাস্থ স্থানীয় কার্যালয়ের মেসার্স ভার্গো মিডিয়ার ১৪৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকা ঋণ পুনর্গঠনের বিপরীতে ডাউন পেমেন্ট ৮ কোটি টাকা, একই শাখার ইব্রাহিম কনসর্টিয়াম ৩৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকার বিপরীতে ডাউন পেমেন্ট মাত্র ৫০ লাখ, গুলশান করপোরেট শাখার মেসার্স প্যানবো বাংলা মাশরুম ৮৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকার বিপরীতে ডাউন পেমেন্ট ২ কোটি এবং রমনা করপোরেট শাখার ডিএসএল সোয়েটার লিমিটেড ১২ কোটি ৬৫ লাখ টাকার বিপরীতে ডাউন পেমেন্ট হিসেবে জমা দিয়েছে মাত্র ৪৩ লাখ টাকা।

এছাড়া নামমাত্র ডাউন পেমেন্ট দিয়ে রংপুরের ৩টি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ পুনর্গঠন করার সুযোগ দেয় রূপালী ব্যাংক। এগুলো হল- রংপুর জিএল রায় রোড করপোরেট শাখার সেকান্দার বীজ হিমাগার ১২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ঋণ পুনর্গঠনের বিপরীতে ডাউন পেমেন্ট দেয় ৯৭ লাখ টাকা, একই শাখার ময়নাকুটি এগ্রো ১৭ কোটি ৫১ লাখ টাকার বিপরীতে ডাউন পেমেন্ট দেয় মাত্র ৭৮ লাখ এবং রংপুর আর কে রোড শাখার অংকুর স্পেশালাইজড কোল্ড স্টোরেজকে ১৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকার বিপরীতে ডাউন পেমেন্ট হিসেবে মাত্র ৪০ লাখ টাকা জমা দেওয়ারও সুযোগ করে দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

এর বাইরে বরিশালের সদর রোড করপোরেট শাখার সোনারগাঁও টেক্সটাইল ১১ কোটি ৪ লাখ টাকা ঋণ পুনর্গঠনের বিপরীতে ডাউন পেমেন্ট দেয় ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, চট্টগ্রামের রূপালী সদন কর্পোরেট শাখার চেমন ইস্পাত ৬৩ কোটি ৬১ লাখ টাকার বিপরীতে ডাউন পেমেন্ট দেয় ৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা এবং খুলনা শামস ভবন করপোরেট শাখার মেসার্স মহসীন জুট মিলসকে ১৫ কোটি ২২ লাখ টাকার বিপরীতে ডাউন পেমেন্ট হিসেবে মাত্র ৪৬ লাখ টাকা জমা দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়।

দুদকের মামলা : পরস্পর যোগসাজশে প্রতারণা ও জালিয়াতির এবং অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গের মাধ্যমে রেলওয়ের ১১৭ শতাংশ জমি বন্ধকি দলিলের মাধ্যমে রূপালী ব্যাংকে বন্ধক রেখেছেন। এর মাধ্যমে ব্যাংকের মেয়াদি প্রকল্প ঋণের বিপরীতে বন্ধক রেখে মোট ১৬১ কোটি ৯১ লাখ ৬৫ হাজার ২৪৫ টাকা আত্মসাতের চেষ্টা করেছেন। এমন দুর্নীতির অভিযোগে রূপালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), উপব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (ডিএমডি) সাত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও তিন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০১৯ সালের ৪ আগস্ট সংস্থার ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ মামলাটি করেন সহকারি পরিচালক এস এম রাশেদুর রেজা।

সার্বিক বিষয়ে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য বাংলা কাগজকে বলেন- যে কোনও অন্যায়-দুর্নীতির অভিযোগ পেলেই যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বাংলা কাগজকে বলেন- এটি আসলে ভাবাই যায় না কোনও ব্যাংকের এমডির কারণে ব্যাংকটি বড় অংকের ক্ষতিতে পড়েছে। কিন্তু এমন ঘটনা এখন সত্যি। এ ধরনের ঘটনার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

অনিয়ম, দুর্নীতি ও জাল-জালিয়াতির ব্যাপারে জানার জন্য রূপালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এম ফরিদ উদ্দিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি সম্ভব হয় নি। কারণ তার সবগুলো নম্বর বন্ধ রয়েছে। পরে তাঁর বাসায় যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর সঙ্গে দেখা করা কিংবা মতামত নেওয়া সম্ভব হয় নি।

প্রসঙ্গত- এম ফরিদ উদ্দিন রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগ দেন ২০১০ সালের ১৮ মার্চ। যোগদানের সময় শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ১ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের ৬ জুন তিনি বিদায় নেয়ার সময় ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ২ হাজার ৩৬০ কোটি টাকায়। এম ফরিদ উদ্দিনের দায়িত্ব পালনকালে রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বাড়ে ১ হাজার ১৬১ কোটি টাকা বা ৯৭ শতাংশ।

তিন দফায় মেয়াদ বৃদ্ধি করায় ব্যাংকটিতে প্রায় ছয় বছর দায়িত্ব পালন করেন এম ফরিদ উদ্দিন। তার মেয়াদকালে ব্যাংকটির কলেবর বৃদ্ধি পেলেও বিপর্যয় হয় প্রায় সব সূচকে। কমে নিট আয়, বাড়ে লোকসানি শাখার সংখ্যাও।

Facebook Comments Box

Contact us

বাংলা কাগজ এ আপনাকে স্বাগতম।

X
Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial
Facebook91m
Twitter38m
LinkedIn4m
LinkedIn
Share