আগস্ট ৩, ২০২১

The Bangla Kagoj

আপনার কাগজ । banglakagoj.net

দ্বিগুণের লক্ষ্য নিলেও এক দশকে বাঘ কমেছে দুই তৃতীয়াংশ

গত ১৩ জুলাই সুন্দরবন এলাকায় মারা যাওয়া একটি বাঘ- বাংলা কাগজ।

২৯ জুলাই ২০১০, দেশে শুরু হয় বিশ্ব বাঘ দিবস পালন। এর দশ বছর পার হলো আজ (২৯ জুলাই,২০২০; বুধবার)। অথচ এই সময়ে নেওয়া হয় দ্বিগুণের লক্ষ্য। বিপরীতে বাঘের সংখ্যা কমেছে দুই তৃতীয়াংশ। জানা গেছে- পৃথিবীর অন্য অঞ্চলে বিপন্ন বাঘ সংরক্ষণে যেমন উদ্যোগই থাকুক না কেন, সুন্দরবনে এজন্য অনেক প্রকল্প হাতে নিয়ে এবং এক দশক ধরে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হলেও বাঘের সংখ্যার উন্নয়ন ঘটেনি। ১৯৭৫ সালে আনুমানিক ধারণা ছিল সুন্দরবনে বাঘ রয়েছে ৩৭৫টি, ১৯৮৪ সালে গবেষণালব্ধ এই ধারণা ছিল ৪৫০টির মতো। আর ১৯৯২-৯৩ সালের জরিপে এই সংখ্যা ছিল ৩৬২টি। তবে এখন সর্বশেষ গবেষণায় ১১৪টির বেশি বাঘের তথ্য নেই বন বিভাগের হাতে। এ অবস্থায় এক দশকের বাঘ দ্বিগুণের লক্ষ্যে নেওয়া বিশ্ব বাঘ দিবসের অনুষ্ঠানে বড় করুণ মুখে আগের সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ থাকার তথ্য দিয়ে নতুন কী কর্মসূচি নেবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, সেটাই এখন দেখার।

নিজস্ব প্রতিবেদন, বাংলা কাগজ : ২৯ জুলাই ২০১০, দেশে শুরু হয় বিশ্ব বাঘ দিবস পালন। এর দশ বছর পার হলো আজ (২৯ জুলাই,২০২০; বুধবার)। অথচ এই সময়ে নেওয়া হয় দ্বিগুণের লক্ষ্য। বিপরীতে বাঘের সংখ্যা কমেছে দুই তৃতীয়াংশ।

সুন্দরবন- বাংলা কাগজ।

জানা গেছে- পৃথিবীর অন্য অঞ্চলে বিপন্ন বাঘ সংরক্ষণে যেমন উদ্যোগই থাকুক না কেন, সুন্দরবনে এজন্য অনেক প্রকল্প হাতে নিয়ে এবং এক দশক ধরে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হলেও বাঘের সংখ্যার উন্নয়ন ঘটেনি। ১৯৭৫ সালে আনুমানিক ধারণা ছিল সুন্দরবনে বাঘ রয়েছে ৩৭৫টি, ১৯৮৪ সালে গবেষণালব্ধ এই ধারণা ছিল ৪৫০টির মতো। আর ১৯৯২-৯৩ সালের জরিপে এই সংখ্যা ছিল ৩৬২টি। তবে এখন সর্বশেষ গবেষণায় ১১৪টির বেশি বাঘের তথ্য নেই বন বিভাগের হাতে। এ অবস্থায় এক দশকের বাঘ দ্বিগুণের লক্ষ্যে নেওয়া বিশ্ব বাঘ দিবসের অনুষ্ঠানে বড় করুণ মুখে আগের সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ থাকার তথ্য দিয়ে নতুন কী কর্মসূচি নেবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, সেটাই এখন দেখার।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, এবার করোনাভাইরাসের কারণে সীমিত আকারে হবে বিশ্ব বাঘ দিবসের অনুষ্ঠান। জাতীয় কর্মসূচিতে ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করবেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. সাহাব উদ্দিন এমপি ও উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার এমপি। এছাড়াও স্থানীয়ভাবে খুলনা ও বাগেরহাটে সীমিতভাবে কর্মসূচি পালিত হবে।

বিশ্ব বাঘ দিবসে স্বভাবতই আলোচনায় থাকবে বাংলাদেশের জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আশঙ্কাজনক সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি। জাতীয় প্রতীক, পরিচয়, খেলার মাঠে নিজেদের টাইগার পরিচিতি ইত্যাদিতে বাঘের জাতি হিসেবে নিজেদের মেলে ধরলেও প্রকৃতির প্রকৃত বাঘ রক্ষায় যে ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়া হচ্ছে তা নিয়ে বিন্দুমাত্র সংশয়ের অবকাশ নেই। গবেষকরা বলছেন, বাঘের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে গবেষণালব্ধ যে কারণগুলো রয়েছে সেগুলোর দিকে নিবিড় মনোযোগ দিতে হবে এখনই।

সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রকৃত সংখ্যা কত : জানা গেছে, ১৯৭৫ সালে বুবার্ট হেনড্রিকস সুন্দরবনে ৩৫০টি বাঘ থাকার তথ্য দিয়েছিলেন। এরপর ১৯৮২ সালে মার্গারেট স্যালটার নমুনা ও সরেজমিন জরিপ চালিয়ে ৪২৫টি বাঘ থাকার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। এর দুই বছর পর রেক্স জিটিন্স সুন্দরবন দক্ষিণ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের ১১০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় জরিপ চালিয়ে ৪৩০ থেকে ৪৫০টি বাঘ থাকার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন।

সুন্দরবন এলাকায় কাজ করেন এমন লোকজনের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে ১৯৯২ সালে ৩৫৯টি বাঘ থাকার তথ্য দিয়েছিল বন বিভাগ। পরের বছর সুন্দরবনের ৩৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্যাগমার্ক পদ্ধতিতে জরিপ চালিয়ে ধন বাহাদুর তামাং ৩৬২টি বাঘের ব্যাপারে তথ্য দিয়েছিলেন।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালের গবেষণায় সুন্দরবনে বাঘ ছিল ৪৪০টি। ২০১৫ সালে ক্যামেরা ট্রাপিংয়ের মাধ্যমে বাঘ গণনা করা হয়। এতে ১০৬টি বাঘের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ২০১৬ সালে আমেরিকার দাতা সংস্থা ইউএসএআইডির অর্থায়নে বাঘ প্রকল্পের মাধ্যমে ক্যামেরার সাহায্যে গণনা করা হয়। খুলনা বিভাগীয় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃত সংরক্ষণ বিভাগ এ প্রকল্পকে জনবল ও ৭০টি ডিজিটাল ক্যামেরা সরবরাহ করে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাঘ প্রকল্প ক্যামেরা ট্রাপিংয়ের মাধ্যমে বাঘ গণনার কাজ শুরু করে। যার ফলাফল ২০১৮ সালেই প্রকাশ করা হয়। ওই ফলাফলে সুন্দরবনের ১১৪টি বাঘের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ৩ বছরের ব্যবধানে সুন্দরবনে ৮টি বাঘ বৃদ্ধির চিত্র ফুটে ওঠে।

সর্বশেষ বাঘশুমারিতে ক্যামেরার সামনে দিয়ে বাঘ চলাচল করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার ছবি পাওয়া যায়। পরে এসব ছবি বিশ্লেষণ করে বাঘের সংখ্যা নিরূপণ করা হয়। সর্বশেষ এই জরিপে সুন্দরবনের ২৩৯টি জায়গায় গাছের সঙ্গে ৪৯১টি ক্যামেরা লাগানো হয়েছিল। ২৪৯ দিন ধরে চালু রাখা ক্যামেরাগুলোতে বাঘের ২,৫০০টি ছবি পাওয়া যায়। ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা ১১৪টি বাঘ থাকার কথা অনুমান করেছেন। বাঘের প্রকৃত সংখ্যা বন বিভাগের কাছে নেই।

তবে বাঘের সঠিক সংখ্যা নিরূপণ প্রায় অসম্ভব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ফিরোজ জামান এ বিষয়ে ২০১৭ সালে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়া বাংলা কাগজকে জানিয়েছিলেন, কয়েক স্তরের জরিপ ছাড়া কেবল একটা দুটি পদ্ধতি ব্যবহার করে কী সংখ্যক বাঘ রয়েছে তা নিরূপণ সম্ভব নয়। ফলে একেকবার একেকরকম তথ্য পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞাপন

কেন কমছে বাঘ : জানা গেছে- ১৯৯০ সালের পর থেকেই সুন্দরবনের ভেতরে বাঘের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করেছে। বনজীবী মানুষের সংখ্যা বাড়া, চোরা শিকারিদের উৎপাত, বনের রাজা আশপাশে থাকলে নিজেই শিকার হয়ে যাওয়ার ভয় ইত্যাদি কারণে বাঘের ওপর মানুষের হামলা ও অত্যাচার বেড়েছে ১৯৯০ পরবর্তী তিন দশকে। বন বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত তিন দশকে বনজীবীদের বনের ভেতরে ঢোকার পারমিটও অতীতের তুলনায় অনেক বেশি দেওয়া হয়েছে। বনজ সম্পদ লুটের ঘটনাও ঘটেছে অতীতের যে কোনও সময়ের তুলনায় বেশি।

১১৪টি বাঘ থাকার তথ্য প্রকাশের পর ২০১৫ সালে তদানীন্তন পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর কাছে যখন জানতে চাওয়া হয়েছিল বাকি বাঘগুলো কোথায় গেলো তখন তিনি বলেছেন, ‘ভারতে বেড়াতে গেছে’। হেঁয়ালিপূর্ণ এ জবাবের পর সরকারের কোনও মন্ত্রী বাঘের সংখ্যা নিয়ে আর কানও উত্তর দেননি। সত্য বটে পশু-পাখি-প্রাণীর অবাধ চলাচলের স্বার্থে ভারত-বাংলাদেশের সুন্দরবনের সীমান্তের মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়নি; তবে সত্যিই বাঘ আসলে কোথায় গেছে নাকি বিলুপ্ত হয়ে গেছে সেটা সরকারিভাবে খুঁজে বের করা জরুরি।

সুন্দরবন নিয়ে যারা গবেষণা করেন এমন বিশেষজ্ঞ এবং বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বাঘের চলাচলের এলাকায় মানুষের বিচরণ, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া, শিকারের সংখ্যা কমে যাওয়া, জলবায়ুগত পরিবর্তন, ঝড় বাদলে বাঘের আশ্রয়স্থলের ক্ষতি ইত্যাদি নানা কারণে বাঘের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা পড়ছে। এছাড়াও চোরা শিকারির গুলিতে বা ফাঁদে নিহত বা আহত হওয়া, পিটিয়ে হত্যা, বাঘের বাচ্চা চুরি, নানা রোগ-বালাইয়ে অসুস্থ হওয়া ইত্যাদি কারণও রয়েছে। সামনে সুন্দরবন ঘেঁষে রামপাল কয়লা প্রকল্প চালু হলে এবং বনের ভেতর দিয়ে অবাধে পণ্যবাহী জাহাজের অবাধ যাতায়াত অব্যাহত থাকলে সুন্দরবনের অভিজাত্য এবং বাঙালির গর্ব রয়েল বেঙ্গল টাইগার হয়তো আর খুঁজেই পাওয়া যাবে না।

সুন্দরবন অ্যাকাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, সুন্দরবনের বাঘ কমে যাচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রতিকূল পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততাসহ নানা কারণে বাঘ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আবার বন বিভাগের নিরাপত্তা দিতে না পারা, শিকারিদের হানা, খাদ্য সংকটে বাঘ বন ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসা, আর পিটুনিতে মৃত্যু হচ্ছে।

তার অভিযোগ, সুন্দরবন রয়েছে অভিভাবকহীন অবস্থায়। এখানে দায়িত্বে থাকার পরও বন বিভাগ অসহায়। পানি, মৎস্য, ভূমি বিভাগসহ কোনও বিভাগের মধ্যে সুন্দরবন নিয়ে সমন্বয় নেই। যে যার মতো করে সুন্দরবনে খবরদারি করে থাকে। এ অবস্থার উত্তরণ জরুরি। সুন্দরবনের জন্য সুনির্দিষ্ট অভিভাবক দরকার।

Facebook Comments Box

Call Now ButtonContact us

বাংলা কাগজ এ আপনাকে স্বাগতম।

X
Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial
Facebook91m
Twitter38m
LinkedIn4m
LinkedIn
Share