আক্রান্তের আসল সংখ্যা ও নাসিমার ব্রিফিং নিয়ে বড় প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদন, বাংলা কাগজ : দেশে কোভিড-১৯ (করোনাভাইরাস)-এ আক্রান্তের আসল সংখ্যা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) ডা. নাসিমা সুলতানার ব্রিফিং নিয়ে দেখা দিয়েছে বড় প্রশ্ন। বিষয়টি নিয়ে সরগরম পাড়ার দোকানপাট, এমনকি বড় শহরের অলিগলিও। বড় বিষয় হলো- রাজধানীতে থাকা সচেতনমহলে বিষয়টি নিয়ে এক রকম আন্দোলনপূর্ব অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তাঁরা চাইছেন, স্বাস্থ্য খাতে সকল দুর্নীতিবাজের পদত্যাগ। এ ধরনের দাবিতে ইতোমধ্যে ৭২ ঘণ্টার সময়ও বেঁধে দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ। আজ (১৩ জুলাই- সোমবার) তাঁদের দেওয়া আলটিমেটামের সময় শেষ হচ্ছে। অব্শ্য মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ সরাসরি স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকেরও পদত্যাগ বা প্রত্যাহার চেয়েছেন (দাবি করেছেন)।

জানা গেছে- করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে মূল প্রশ্ন তৈরি হয়েছে জেকেজি এবং রিজেন্ট হাসপাতালের জালিয়াতির বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরপরই। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ। আবার একে তো ক্ষোভ, তার ওপর সৃষ্টি হচ্ছে শঙ্কাও। রয়েছে বিতৃষ্ণা। কারণ বিশ্বজুড়ে চলা এ মহামারিতে স্বাস্থ্য খাতে এমন জালিয়াতি যেন কোনোভাবেই মানতে পারছে না সাধারণ মানুষ।

সর্বশেষ (১২ জুলাই) তথ্যমতে, বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা এক লাখ ৮৩ হাজার ৭৯৫ জন। একই সময়ে মারা গেছেন দুই হাজার তিনশ ৫২ জন।

জানা গেছে, করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষায় ব্যাপক জালিয়াতি করেছে মো. সাহেদের রিজেন্ট হাসপাতাল। একইসঙ্গে একই ধরনের জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ছিলো জেকেজিও। যার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং চেয়ারম্যানকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। সবমিলে শুধু এ প্রতিষ্ঠানেরই (জেকেজি) গ্রেপ্তার হয়েছেন সাতজন। গ্রেপ্তারের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ গ্রেপ্তার হয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী। রোববার (১২ জুলাই) তাঁকে গ্রেপ্তার করে তেজগাঁও থানা পুলিশ। পরে আজ (সোমবার) আদালতে ডা. সাবরিনার রিমান্ড চেয়েছে পুলিশ। অপরদিকে রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে যেকোনও সময়। যা নিয়ে ইতোমধ্যেই বক্তব্য দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল।

সূত্র জানায়, জেকেজি এবং রিজেন্ট হাসপাতালকে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার জন্য মূলত অনুমোদন দেওয়া হয় স্বাস্থ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্মিলিত কার্যাবলি সম্পন্নের মাধ্যমেই। কিন্তু এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দাবি করছে, এ ধরনের অনুমোদন দেওয়ার জন্য সব কাজ সম্পন্ন করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এক্ষেত্রে শুধু স্বাস্থ্য অধিপ্তরের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন অধিদপ্তরটির ডিজি (মহাপরিচালক) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ মন্ত্রণালয়ের বেশকিছু সদস্য।

জানা গেছে- জালিয়াতির ঘটনায় ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে শোকজ (কারণ দর্শানোর নোটিশ) করা হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদকে। তাঁর দোষ তিনি বলেছেন, জেকেজি এবং রিজেন্ট হাসপাতালকে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা করতে দেওয়ায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সায় ছিল। আর জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালের কার্ডিয়াক সার্জন ডা. সাবরিনাকে বরখাস্ত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তাঁরও দোষ একই রকম। অর্থাৎ তিনি নিজের প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতির বিষয়ে মুখ খুলেছিলেন। বলেছিলেন, তাঁদের সব জালিয়াতির বিষয় জানতেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদ এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক সুলতানা।

উল্লেখ করা যেতে পারে- করোনাভাইরাসে আক্রান্ত, মৃত ও সুস্থদের নিয়ে স্বাস্থ্য অধিপ্তরের নিয়মিত স্বাস্থ্য বুলেটিন অনলাইনে প্রকাশ করে থাকেন এই সুলতানাই।

বিজ্ঞাপন

সূত্র আরও জানায়, শিগগিরই গ্রেপ্তার হচ্ছেন রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ। একইসঙ্গে ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে জেকেজি গ্রুপের বিরুদ্ধেও।

জানা গেছে- স্বাস্থ্য খাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জালিয়াতি ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও জাল-জালিয়াতির ধারাবাহিকতায় জড়িয়ে পড়েছে জেএমআই গ্রুপও। গ্রুপটির বিরুদ্ধে করোনাকালে নিরাপত্তা সামগ্রি বিশেষ করে এন-নাইন্টি ফাইভ মাস্ক জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। যা এক রকম প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির বিলই আটকে দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- দেশের স্বাস্থ্য খাতের এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত প্রকৃত রোগীর সংখ্যা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ধোঁয়াশা।

সূত্র আরও জানায়, দেশে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত বেসরকারি বেশকিছু প্রতিষ্ঠানই এখনও ফলাফল দিতে পারছে না ঠিকভাবে। এর মূল কারণ হয় তাঁরা নমুনা ফেলে দিয়ে আক্রান্তের সংখ্যার হিসাব কষছেন, নতুবা আসছে বেশকিছু ভুল রিপোর্টও। এমনক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন ক্ষুদে ডায়াগনস্টিক এমনকি বড় রোগ নির্ণয়কারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন নিয়েও রয়েছে অসংখ্য প্রশ্ন। কারণ বিভিন্ন রোগের ক্ষেত্রে আগে থেকেই দেশ ও বিদেশের প্রতিবেদনে পাওয়া যাচ্ছে গরমিল। এক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর যাবার প্রয়োজন নেই শুধু প্রতিবেশি দেশ ভারতের মাদ্রাজে গেলেই পাওয়া যাচ্ছিল এর প্রমাণ। এ ধরনের বেশকিছু প্রমাণ রয়েছে বাংলা কাগজের হাতে।

এমন অবস্থায় সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞমত, যে রোগের (কোভিড-১৯) কোনও প্রতিষেধক এখনও আবিষ্কৃত হয় নি, সে রোগের পরীক্ষা নিয়ে এত হইচই- আসলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ভীতির সঞ্চার করছে। কারণ এমন অসংখ্য প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে- যেখানে অসংখ্য মানুষের আসলে করোনাভাইরাসের মতো কোনও রোগই হয় নি। অথচ বড় বিষয় হলো- এমন কিছু মানুষ দুশ্চিন্তা বা অন্য কারণে হৃদরোগ বা এ ধরনের রোগে হঠাৎ আক্রান্ত হয়েই মারা গিয়েছেন বা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।

সবমিলে বিশেষজ্ঞদের মত এমনটাই- সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপকহারে জাগিয়ে তুলতে হবে সচেতনতা। একইসঙ্গে তাঁদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে, নিজেদের চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্য সাধারণ সময়ের ন্যায় চালিয়ে নিতে। অন্যথায় অর্থনীতির চাকায় ঘুণপোকা ধরতে পারে বলেই তাঁদের শঙ্কা।

Facebook Comments Box

Leave a Reply

Your email address will not be published.