যেভাবে ধরা পড়ল রিজেন্ট

নিজস্ব প্রতিবেদন, বাংলা কাগজ : করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরুতে প্রথম যে বেসরকারি হাসপাতালকে এই রোগের চিকিৎসার দায়িত্ব সরকার দিয়েছিল, সেই রিজেন্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছিল কিছুদিন ধরেই।

সোমবার (৬ জুলাই) উত্তরায় রিজেন্ট হাসপাতালে র‌্যাবের অভিযানের আগে এ রকম কয়েকটি অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করে সংস্থাটি। তাতে করোনাভাইরাস পরীক্ষার ভুয়া প্রতিবেদন দেওয়ার প্রমাণ পেয়েই অভিযানে যায় তাঁরা।

সেখানে গিয়ে অনিয়ম দেখে ‘বিস্মিত’ হয়ে গেছেন র‌্যাব কর্মকর্তারা, তাদের ভাষায় যেন ‘কেচো খুঁড়তে সাপ’ বেরিয়েছে।

মন্ত্রী, এমপি, বড় বড় কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদের ছবি ঘুরছে ফেইসবুকে। কথিত প্রভাবশালী এই ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতি ধরার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয়েছিল র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান সারওয়ার বিন কাশেমের কাছে।

তিনি বুধবার বাংলা কাগজকে বলেন, “ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমাদের কাছে বিভিন্নভাবে রিজেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছিল। কেউ বলছেন, নমুনা সংগ্রহ করে নেওয়ার পরেও তারা কোনো প্রতিবেদন দিচ্ছে না। কেউ বা বিনা পয়সার কোভিড-১৯ পরীক্ষার কথা থাকলেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ করছেন।

“আবার যে ওয়েবসাইটে প্রতিবেদন পাওয়ার কথা সেখানে না পেয়ে ব্যক্তিগত মেইলে প্রতিবেদন পাওয়ার বিষয়ে অভিযোগ করেন।”

ব্যক্তিগত পর্যায়ে আসা এই সব অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করা হয় জানিয়ে সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, “তদন্তে নেমে আমরা কেঁচো খুঁড়তে সাপ পেয়েছি।”

রিজেন্টের জালিয়াতির ঘটনায় মঙ্গলবার রাতে উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলা করেছেন র‌্যাবের উপ-পরিদর্শক জুলহাস মিয়া।

সেখানে তিনি লিখেছেন, রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা শাখায় এবং তাদের প্রধান কার্যালয়ে অভিযানের আগে কোভিড -১৯ পরীক্ষার ১০টি প্রতিবেদন নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছিলেন তাঁরা।

দুটি পরিবারের ১০ সদস্যকে রিজেন্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া প্রতিবেদনগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ইনিস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথের (আইপিএইচ) পরিচালক এবং একজন ভাইরোলজিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি।

প্রতিবেদনগুলোতে এই দুজনের স্বাক্ষর ছিল জানিয়ে তিনি বলেছেন, “তাঁরা দেখে বলেছেন, এগুলো তাদের বিভাগ থেকে সরবরাহ করা নয়, ভুয়া।”

এরপর ৬ জুলাই তাদের কাছে খবর আসে রিজেন্ট হাসপাতালে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে চিকিৎসা সেবার পাশপাশি কোভিড-১৯ এর ভুয়া প্রতিবেদন তৈরির কাজ চালছে।

এসব তথ্য পাওয়ার পরপরই ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলমের নেতৃত্বে সোমবার সোয়া সাতটার দিকে উত্তরা রিজেন্ট হাসপাতালে র‌্যাবের অভিযান শুরু হয়।

এই অভিযানের প্রথম দিন ওই হাসপাতাল থেকে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

“চারজনই জানায়, এসব প্রতিবেদন তৈরি হত রিজেন্ট হাসপাতালের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে।”

অপরদিকে- বর্তমানে সাহেদ ছাড়াও পালিয়ে আছেন তার এপিএস পলাশ (২৮), মাসুদ পারভেজ (৪০), তরিকুল ইসলাম (৩৩), আব্দুর রশিদ খান জুয়েল (২৯), শিমুল পারভেজ (২৫), দীপায়ন বসু (৩২), মাহবুব (৩৩) ও সৈকত (৩৯)।

বিজ্ঞাপন

পরে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের ১৪ নম্বর বাসায় রিজেন্ট হাসপাতালের প্রধান কার্যালয়ে অভিযানে যান।

সেখান থেকেও চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয় জানিয়ে এসআই জুলহাস মামলায় লিখেছেন, “এরা প্রত্যেকেই জানিয়েছে, চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদের নির্দেশে তারা এই ভুয়া প্রতিবেদন তৈরি করেন।”

এই পরীক্ষার জন্য রিজেন্ট হাসপাতাল একেকজনের কাছ থেকে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা করে নিয়েছিল।

“হাসপাতাল ও প্রধান কার্যালয়ে অভিযান চালানোর পর র‌্যাব জানতে পারে, কোভিড-১৯ ফরমে বিনামূল্যে লেখা থাকলেও প্রায় ৬ হাজার জনের পরীক্ষা করিয়েছে টাকার বিনিময়ে। এসব পরীক্ষার অধিকাংশই ভুয়া।”

র‌্যাব কর্মকর্তা সারোয়ার আলম বাংলা কাগজকে বলেন, “তারা যে ভুয়া প্রতিবেদন দিত, এ ব্যাপারে যথেষ্ট প্রমাণ পেয়েছি। এছাড়া রিজেন্ট হাসপাতালের কর্মচারীরা স্বীকারও করেছে, তারা চেয়ারম্যানের নির্দেশে এসব করেছিল।

“তাঁদের এসব প্রতিবেদনের কারণে কারও পজিটিভ থাকলেও ভুয়া নেগেটিভ প্রতিবেদন থাকায় তিনি সমাজের লোকজনের সাথে মিশেছেন। ফলে কোভিড- ১৯ সংক্রমণ ছড়িয়েছে বিভিন্নভাবে।”

রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক সাহেদসহ পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে একাধিক টিম কাজ করছে বলে র‌্যাবের গোয়েন্দা প্রধান সারওয়ার বিন কাশেম জানিয়েছেন।

বুধবার (৮ জুলাই) রাত দশটার দিকে তিনি বাংলা কাগজকে বলেন, “মূল আসামির সঙ্গে অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। কিন্তু তাঁরা বেশিক্ষণ এক স্থানে থাকছে না, ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করছে।

“আত্মীয়-স্বজন বা যেসব জায়গায় সাহেদ গোপনে আশ্রয় নিতে পারেন, এ রকম সম্ভাব্য সব জায়গায় বিভিন্নভাবে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।”

করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে চিকিৎসার নামে প্রতারণা করা বেসরকারি রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরার প্রধান কার্যালয় বন্ধের পরদিন বুধবার তাঁদের মিরপুর শাখাও বন্ধ করে দেয় র‌্যাব।

‘শিগগিরই’ এ বিষয়ে ‘সুসংবাদ’ দিতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

র‌্যাব ছাড়াও এ ঘটনায় মামলা হয়েছে যে থানায় সেই উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ এবং গোয়েন্দা পুলিশ রিজেন্টের মালিকসহ পলাতকদের গ্রেপ্তারে কাজ করছে বলে পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার নাবিদ কামাল শৈবাল জানিয়েছেন।

আর পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার বাংলা কাগজকে বলেছেন, তারাও এই মামলাটিকে গুরুত্ব দিয়ে ছায়া তদন্ত করছেন।

সোম ও মঙ্গলবার টানা দুই দিনের অভিযানের পর মঙ্গলবার রাতে উত্তরা পশ্চিম থানায় র‌্যাবের এসআই জুলহাস যে মামলা করেছেন সেখানে সাহেদসহ ১৭ জনকে আসামি করা হয়েছে।

তাঁদের মধ্যে দুই দিনের অভিযানে গ্রেপ্তার আটজনও রয়েছেন। তাদের একজনকে গাজীপুর কিশোর সংশোধনাগারে পাঠিয়ে বাকি সাতজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত।

Facebook Comments Box

Leave a Reply

Your email address will not be published.