বিপুল সম্পদের মালিক সিকদার পরিবার

নিজস্ব প্রতিবেদন, বাংলা কাগজ : দেশ-বিদেশে বিপুল সম্পদের মালিক জয়নুল হক সিকদারের পরিবার। জয়নুল হক সিকদার ন্যাশনাল ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান। তাঁর পরিবারের প্রতি সদস্যের রয়েছে বিপুল সম্পদের মালিকানা।

জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ক্যারিবিয়ান দ্বীপরাষ্ট্র সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসে কার্যক্রম শুরু করে কয়ি রিসোর্ট অ্যান্ড রেসিডেন্স। যেটি পরিচালনা করছে বিশ্বখ্যাত হিলটন কর্তৃপক্ষ। বিনিয়োগের বিপরীতে নাগরিকত্ব সুবিধার আওতায় ৫৩ হাজার জনসংখ্যার দেশটিতে এ চার তারকা হোটেল গড়ে তোলা হয়েছে। এই কয়ি রিসোর্টের কর্ণধার বাংলাদেশের সিকদার পরিবার।

কয়ি রিসোর্টের নিজস্ব প্রকাশনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সিকদার গ্রুপের চেয়ারম্যান জয়নুল হক সিকদার এবং যুক্তরাষ্ট্রের কয়ি গ্রুপ ও কেআরএল হসপিটালিটির প্রধান নির্বাহী ও চেয়ারম্যান নিক হক সিকদার এ রিসোর্টের নির্মাতা। তাঁরা সম্পর্কে পিতা-পুত্র।

সিকদার পরিবারের মালিকানাধীন কয়ি রেস্টুরেন্ট রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস ও নিউইয়র্ক, প্রমোদ নগরী হিসেবে খ্যাত লাসভেগাস, সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি ও থাইল্যান্ডের ব্যাংককেও। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডে রয়েছে সিকদার পরিবারের একাধিক কোম্পানি ও বিপুল বিনিয়োগ। রয়েছে টেলিভিশন চ্যানেলও।

বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায়ও সিকদার পরিবারের সম্পদ ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রয়েছে। ব্যাংক, বিমা, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন, নির্মাণ, হোটেল, পর্যটন ও এভিয়েশনসহ বিভিন্ন খাতে গ্রুপটির ব্যবসা রয়েছে। পরিবারটির সবচেয়ে বড় ব্যবসা এখন বিদ্যুৎ খাতের পাওয়ার প্যাক হোল্ডিং। পাওয়ার প্যাক হোল্ডিংয়ে ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে- থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে সিকদার গ্রুপের ব্যবসা রয়েছে। কোথায় কী ব্যবসা— এ নিয়ে সেখানে কিছু লেখা নেই। এর সূত্র ধরে বিভিন্ন দেশের কোম্পানি নিবন্ধন কার্যালয়ে খোঁজ নিয়েই বিদেশে বিপুল বিনিয়োগের এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

থাইল্যান্ড পর্ব
২০১৮ সালের এপ্রিলে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বড় আয়োজন করে চালু হয় কয়ি রেস্টুরেন্ট স্যাথর্ন ও দ্য ক্লাব অ্যাট কয়ি। এটা মূলত কয়ি গ্রুপের বর্ধিত হোটেল ও বিনোদন ব্যবসা। এতে যোগ দেন বিভিন্ন দেশের তারকারা। নিক হক সিকদার, রন হক সিকদার ও রিক হক সিকদারের সৌজন্যে এতে দেওয়া হয় রাজসিক ভোজ। ২০১৮ সালের ১২ মে সেই অনুষ্ঠানের ৩৬টি ছবিসহ বিস্তারিত প্রতিবেদন ছাপা হয় থাইল্যান্ড থেকে প্রকাশিত লুকইস্ট নামের একটি ম্যাগাজিনে। সেখানে প্রথমেই বলা আছে, অনুষ্ঠানে কয়ি গ্রুপের রিক ও রন হক সিকদারের সৌজন্যে যত খুশি জাপানিজ খাবার, ককটেল এবং ওয়াইন সরবরাহ করা হয়।

অবশ্য থাইল্যান্ডে এটাই তাঁদের প্রথম বিনিয়োগ নয়। ২০০৫ সালে ব্যাংককের সুকুম্ভিতে প্রথম কয়ি রেস্টুরেন্ট চালু করে তাঁরা। এরপর দেশটির নানা শহরে চালু হয় এর শাখা। থাইল্যান্ডের ফুকেট ও পাতায়াতেও বিভিন্ন নামে হোটেল ও বিনোদন ব্যবসা রয়েছে তাঁদের।

থাইল্যান্ডের কোম্পানি নিবন্ধনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালের ১৮ আগস্ট থাইল্যান্ডে কয়ি রেস্টুরেন্ট কোম্পানি নিবন্ধিত হয়। ওই সময়ে এর মূলধন ছিল ৬ কোটি বাথ, ওই সময়ে বাংলাদেশি টাকায় যা ছিল মাত্র ৯ কোটি টাকা। এর পরিচালক রিক হক সিকদার, রন হক সিকদার, সৈয়দ কামরুল ইসলাম ও জোনগ্রুক প্রুকপ্রেট।

এর মধ্যে সৈয়দ কামরুল ইসলাম (মোহন নামে পরিচিত) সিকদার গ্রুপের প্রধান পরিচালক কর্মকর্তা এবং জোনগ্রুক প্রুকপ্রেট থাইল্যান্ডের নাগরিক। এই কোম্পানিতে পরিচালক চারজন হলেও শেয়ারধারী সাতজন। তাঁদের মধ্যে মার্কিন নাগরিক রিক হক সিকদার ও রন হক সিকদারের ৪৯ শতাংশ ও জোনগ্রুক প্রুকপ্রেটের ৫১ শতাংশ। আরও চারজন বাংলাদেশি পরিচালক থাকলেও শুরুতে কাগজে–কলমে তাঁদের কোনো বিনিয়োগ ছিল না। এরপর থাইল্যান্ডের একাধিক শহর ও পর্যটনকেন্দ্রে তারকা হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ক্লাব, স্পা ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলে পরিবারটি।

থাইল্যান্ডে সিকদার গ্রুপের রয়েছে কার্লস জুনিয়র রেস্টুরেন্ট এবং হার্ডিস রেস্টুরেন্ট নামে আরও দুটি চেইন রেস্তোরাঁ। এ দুটি রেস্তোরাঁ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক বার্গার খাবারের জন্য বিখ্যাত। বিশ্বের ৪৩টি দেশে তাদের ৩ হাজার ৮০০ রেস্তোরাঁ (ফ্র্যাঞ্চাইজি) রয়েছে। এর মধ্যে ৬টি আছে থাইল্যান্ডের বিভিন্ন স্থানে, যা পরিচালনা করে আরঅ্যান্ডআর রেস্টুরেন্ট গ্রুপ। থাইল্যান্ডের বিখ্যাত পত্রিকা ব্যাংকক পোস্ট গত ২০১৮ সালের ৯ নভেম্বর এ নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই আরঅ্যান্ডআর গ্রুপের দুই মালিক রিক ও রন হক সিকদার। উল্লেখ্য, বাংলাদেশেও তাঁদের আরঅ্যান্ডআর এভিয়েশন নামে একটি কোম্পানি আছে, যার উড়োজাহাজে করেই রোগী সেজে রন ও দিপু হক সিকদার দেশে ছেড়ে ব্যাংককে চলে যান। দেশে তাঁদের এই কোম্পানির সাতটি হেলিকপ্টার ও দুটি উড়োজাহাজ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্র পর্ব
এ-তো গেল থাইল্যান্ড পর্ব। এরপর যাওয়া যাক যুক্তরাষ্ট্র বা আমেরিকায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের চ্যান্ডলার শহরে ২০১৬ সালে কার্যক্রম শুরু করে অড়োয়া ভিলাস অ্যাপার্টমেন্ট এলএলসি। ২০১৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর এই কোম্পানি নিবন্ধিত হয়। কোম্পানি নম্বর হচ্ছে এল২১২১৫৬১৭। ওই শহরে ফ্ল্যাট বিক্রির ব্যবসা করে এই প্রতিষ্ঠান। এর মালিক পারভীন হক সিকদার, তিনি জয়নুল হক সিকদারের মেয়ে ও আওয়ামী লীগ দলীয় সংরক্ষিত আসনের সাংসদ। নিবন্ধনের সময় তাঁর ঠিকানা দেওয়া আছে, ৬০১৫ ডব্লিউ ট্রোভিটা প্লেস, চ্যান্ডলার, অ্যারিজোনা ৮৫২২৬।

আবার ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন স্থানে কমপক্ষে ৮টি স্বয়ংক্রিয় কার ওয়াশ ও একাধিক সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনও রয়েছে তাঁদের।

আমেরিকার ট্রাম্প টাওয়ারসহ বিভিন্ন স্থানে রয়েছে কয়ি রেস্টুরেন্টের শাখা। নথিপত্রে কয়ি গ্রুপের চেয়ারম্যান নিক হক। কেআরএল হসপিটালিটিসহ দেশটিতে তাঁদের আরও অনেক ব্যবসা আছে। দেশটিতে তাঁদের আবাসন ব্যবসাও রয়েছে।

লন্ডন, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ড পর্ব
এবার ঘুরে আসা যাক লন্ডন থেকে। যুক্তরাজ্যের কোম্পানিজ হাউসের তথ্যমতে, ২০১৬ সালে লন্ডনে সিকদার গ্রুপ নিবন্ধিত হয়। এর পরিচালক রন হক সিকদার ও রিক হক সিকদার। তাঁদের দুজনেরই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া আছে। আর তাঁদের ঠিকানা দেওয়া আছে থাইল্যান্ডের সুকুম্ভিতে।

এবার দেখে আসি সিঙ্গাপুরে ব্যবসা নিবন্ধন কার্যালয়ের তথ্য। ওই কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সিকদার গ্রুপের মালিকানাধীন ইন্টার এশিয়া গ্রুপ পিটিই। এর অধীনেই থাইল্যান্ডের পাতায়ায় রয়েছে ১৪টি বিশেষ ধরনের স্বতন্ত্র ভিলা ও জমিতেন সমুদ্রসৈকতে তৈরি বাড়ি (সি ব্রিজ রেসিডেন্স)। এ ছাড়া সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের কয়ি রিসোর্টও ইন্টার এশিয়া গ্রুপের অধীনে। ইন্টার এশিয়ার কার্যালয় রয়েছে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশে।

সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের হোটেল এবং রিসোর্ট নির্মাণ ও কার্যক্রম শুরু নিয়ে একাধিক রিপোর্ট ছাপা হয়েছে সে দেশের স্থানীয় পত্রিকায়। এর মধ্যে সাউথ ফ্লোরিডা ক্যারিবিয়ান নিউজে এ–সংক্রান্ত প্রতিবেদনে কয়ি হসপিটালিটি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিক হক ‍সিকদারের বক্তব্য রয়েছে। এই হোটেল নির্মাণ তাঁর স্বপ্নপূরণ—এ কথা উল্লেখ করে তাঁদের কার্যক্রম লস অ্যাঞ্জেলেস, লাস ভেগাস, নিউইয়র্ক, ব্যাংকক ও আবুধাবিতে আছে বলে তিনি জানিয়েছেন। আবার এসকেএন নিউজে চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই হোটেল নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে।

প্রতিবেদনের সঙ্গে প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা গেছে, ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে হোটেলের জায়গা পরিদর্শন করছেন সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ড. ডেনজিল এল ডগলাস ও হক সিকদার।

আর সুইজারল্যান্ডে খোঁজ নিয়ে মিলল যে কেবল হোটেল বা আবাসন নয়, রীতিমতো দেশটির একটি টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক এই পরিবার। সিএনএন মানি সুইজারল্যান্ডের চার পরিচালকের মধ্যে তিনজনই বাংলাদেশের। এর মধ্যে দুজন হলেন রিক হক সিকদার ও রন হক সিকদার। আরেকজন আরএসএ ক্যাপিটালের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান সামির আহমেদ। সিএনএন মানি সুইজারল্যান্ডের ওয়েবসাইটে তাঁদের নামও দেওয়া আছে। সিএনএন মানি সুইজারল্যান্ড সিএনএনের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে দেশটিতে বাণিজ্য সংবাদ প্রচার করে থাকে।

সিকদার গ্রুপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে, এমন কয়েকজন প্রথম আলোকে জানান, স্বাধীনতার পর জয়নুল হক সিকদার আমেরিকায় পাড়ি দিয়েছিলেন। ওই সময়ে দেশটিতে তিনি ছোট আকারে ব্যবসা শুরু করেন। এরপর দেশে ফিরে আসেন। এখন তিনি ও তাঁর সন্তানেরা বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করছেন।

Facebook Comments Box

Leave a Reply

Your email address will not be published.