Category: অধিকার ও বাক্-স্বাধীনতা

রায়হান কবিরের মুক্তি দাবি হিউম্যান রাইটস ওয়াচের

নিজস্ব প্রতিবেদন, বাংলা কাগজ : মালয়েশিয়ায় অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সরকারের নীতির সমালোচনার করার প্রতিশোধ হিসেবে বাংলাদেশি শ্রমিক রায়হান কবিরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। নিজেদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে দেওয়া এক বিবৃতিতে তার মুক্তির দাবিও করেছে সংস্থাটি।

আজ বুধবার (২৯ জুলাই) রায়হান কবিরের মুক্তি দাবি করে বিবৃতি দিয়েছে সংস্থাটি।

মালয়েশিয়ায় অভিবাসীদের ওপর সরকারের নিপীড়ন নিয়ে আল-জাজিরা টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মী রায়হান কবির। তার জের ধরে ২৪ জুলাই তাঁকে গ্রেপ্তারের পর ১৪ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে মালয়েশিয়ার পুলিশ।

দেশটির অভিবাসন পুলিশের মহাপরিচালক ঘোষণা দিয়েছেন, রায়হান কবিরকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে এবং আজীবনের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করা হবে, যেন তিনি আর মালয়েশিয়ায় ঢুকতে না পারেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক উপ-পরিচালক ফিল রবার্টসন এক বিবৃতিতে বলেন, রায়হান কবিরের বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের নেওয়া পদক্ষেপ সব অভিবাসী শ্রমিকদের অবাধ গ্রেপ্তার, বহিষ্কার, কালো তালিকাভুক্তির মতো অধিকার হরণের মতো ঘটনায় কথা বলার বিরুদ্ধে একটি শীতল বার্তা দিচ্ছে। তথ্যচিত্রের একজন বক্তব্যদাতাকে গ্রেপ্তার করা মানে মালয়েশিয়ার বাক স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের বিধ্বংসী হামলা।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের আচরণ নিয়ে ৩ জুলাই প্রচারিত আল জাজিরার একটি তথ্যচিত্রে রায়হান কবির বক্তব্য দেন।

এরপর রায়হান কবির এবং আল জাজিরা-উভয় মালয়েশিয়ার সরকারের টার্গেটে পরিণত হয় বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বিবৃতি উল্লেখ করেছে।

আল জাজিরার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা, মানহানি এবং যোগাযোগ ও মাল্টিমিডিয়া আইন লংঘন সম্পর্কিত অভিযোগ আনা হচ্ছে।

গ্রেপ্তারের প্রথম দিনে সাংবাদিকদের কাছে লেখা একটি চিঠিতে রায়হান কবির বলেন, আমি কোনো অপরাধ করিনি। আমি মিথ্যা বলিনি। আমি শুধুমাত্র অভিবাসীদের ওপর বৈষম্যের প্রতিবাদ করেছি। আমি চাই অভিবাসী ও আমার দেশের সম্মান নিশ্চিত হোক। আমার বিশ্বাস, সব অভিবাসী এবং বাংলাদেশি আমার পাশে থাকবে।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ২১টি সিভিল সোসাইটি গ্রুপ রায়হান কবিরকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, রায়হান কবিরের ব্যাপারে যেভাবে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিয়েছে, তার প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে।

আল জাজিরার তথ্যচিত্রটি প্রচার হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ ব্যাপক অনুসন্ধান শুরু করে। সেখানে তার ছবি, নাম, ঠিকানার ব্যবহার করা হয়, যা অভিবাসীদের জন্য প্রতিকূল হয়ে ওঠা দেশটিতে তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, বিদেশিদের নিয়ে অহেতুক ভয়ের এই সময়ে রায়হান কবিরের ওপর মালয়েশিয়ার সরকারের এই রকম প্রকাশ্য হামলা বিরোধী শক্তিকে রসদ জোগাবে।

সংস্থাটি বলছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকারে দেশের নাগরিকদের পাশাপাশি বিদেশি নাগরিকদেরও সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে এবং তাদের বাক স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।

২০২০ সালের ৩ জুলাই আল জাজিরা টেলিভিশনের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে ‘লকডআপ ইন মালয়েশিয়ান লকডাউন-১০১ ইস্ট’ শীর্ষক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ২৫ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের ওই প্রতিবেদনে করোনা ভাইরাস মহামারিতে মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসীদের সঙ্গে সরকারের নিপীড়ন নিয়ে কথা বলেন রায়হান কবির। এর জের ধরে ২৪ জুলাই গ্রেপ্তারের পর তাকে ১৪ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। গ্রেপ্তারের আগেই রায়হানের ওয়ার্ক পারমিট কেড়ে নেওয়া হয়।

ল’ইয়ারস ফর লিবার্টি (এলএফএল) নামের মালয়েশিয়ার একটি মানবাধিকার সংগঠনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘স্পষ্টতই আল জাজিরার প্রামাণ্যচিত্রে বৈষম্য নিয়ে কথা বলার কারণে কর্তৃপক্ষের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের শিকার হয়েছেন রায়হান।’

আল জাজিরা-র এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা মৌলিক মানবাধিকার। সে কারণেই তারা রায়হান কবিরের গ্রেফতারকে উদ্বেগজনক মনে করছে। কারণ, রায়হান কণ্ঠহীন ও নিপীড়িত মানুষের পক্ষে কথা বলেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, আল জাজিরা একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি এর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছে। একে অপরাধ হিসেবে বিবেচনার কোনও সুযোগ নেই।

রায়হান কবিরের বাড়ি বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের বন্দরে। তার বাবা শাহ আলম একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। ২০১৪ সালে তোলারাম কলেজে থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে মালয়েশিয়া চলে যান রায়হান।

আইএলওতে প্রধানমন্ত্রীর তিন দফা

বাসস : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার (৮ জুলাই) অভিবাসীদের ওপর করোনাভাইরাস মহামারীর বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় সব দেশের অংশগ্রহণে একটি ‘জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের’ আহ্বান জানিয়ে এ লক্ষ্যে তিন দফা পরামর্শ উপস্থাপন করেছেন।

সুইজারল্যান্ডের জেনেভাতে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ভার্চুয়াল গ্লোবাল শীর্ষ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘ভাইরাসটি বৈষম্যমূলক আচরণ করে না, তবে এর প্রতিকূল প্রভাবগুলো ঝুঁকিপূর্ণ লোকজন বিশেষত অভিবাসী ও মহিলা শ্রমিকদেরওপর মারাত্মক বৈষম্য সৃষ্টি করেছে।’

শেখ হাসিনা আরও বলেন,‘আমাকে অবশ্যই বলতে হবে যে, এখন সব দেশ, সকল আন্তর্জাতিক সংস্থা, সুশীল সমাজ সংগঠনএবং বেসরকারী খাতের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি জোরালো ও সুসংহত বৈশি^ক পদক্ষেপ প্রয়োজন।’

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ‘বৈশ্বিক নেতাদের দিবস’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থাপন করা তিন দফা প্রস্তাব হলো-

প্রথমত, এই সংকটের সময়বিদেশের বাজারগুলোতে অভিবাসী কর্মীদের চাকরি বজায় রাখতে হবে;

দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠান বন্ধের ক্ষেত্রে, ক্ষতিপূরণ এবং অন্যান্য সুবিধাপুরোপুরি প্রদান করার পাশাপাশি তাদের সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যসুবিধা নিশ্চিত করতে হবে; এবং

তৃতীয়ত, মহামারীর পরে, অর্থনীতি পুনরায় সক্রিয় করার জন্য এই শ্রমিকদের নিয়োগ দিতে হবে।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা এবং সংকট মোকাবেলায় গৃহীত ব্যবস্থাসমূহ উল্লেখ করেপ্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ গভীরভাবে আইএলওর সকল প্রচেষ্টার প্রশংসা করে।

তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ মহামারিতে আইএলও’র গ্লোবাল লিডারস দিবসে এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পেরে আমি আনন্দিত। এ মহামারী আমাদের দেশসমূহ, বিশেষত আমাদের শ্রমিকদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বব্যাপী এই বিপর্যয় এখন বিশ্বায়ন ও যোগাযোগেরমূলভিত্তিকে হুমকির মুখে ফেলেছে, যা আমরা সুদীর্ঘ সময় ধরে অনেক যতেœ গড়ে তুলেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটি এখন কেবল স্বাস্থ্য সমস্যা নয় বরং একটি পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সঙ্কটে পরিণত হয়েছে।’

তিনি বলেন, অন্যান্য সঙ্কটের মতো, এলডিসি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোই কোভিড মহামারীর মূল বোঝার মুখোমুখি হচ্ছে যদিও এই সংকট তাদের দিয়ে শুরু হয়নি।

তিনি বলেন, ‘এই মহামারীর কারণে আমাদের দেশীয় ও বৈদেশিক সরবরাহ চেইনগুলো মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। আমরা কয়েক বিলিয়ন ডলারের রফতানি আদেশ হারিয়েছি, আমাদের অনেক শিল্প বন্ধ হয়ে গেছে এবং লক্ষ লক্ষ শ্রমিক তাদের চাকরি হারিয়েছে।’

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের ক্ষুদ্রশিল্প তাদের বেশিরভাগ সম্পদ ও বাজার হারিয়েছে এবং সর্বোপরি সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার কারণে কৃষি ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এর ওপর, আমরা মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোভিড-১৯ সঙ্কট শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকার দেশের অর্থনীতির বিভিন্নখাতের জন্য ১২.১বিলিয়ন ডলার উদ্দীপনা প্যাকেজএবং পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন অংশের জন্য সহায়তাঘোষণা করে।

তিনি বলেন, ‘এই সহায়তা প্যাকেজ আমাদের জিডিপির ৩.৭%-এর সমান। রফতানি শিল্পে আমাদের শ্রমিকদের সহায়কা দিতে আমরা শ্রমিকদের মজুরি দেওয়ার জন্য প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার দিয়েছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তার সরকার পোশাক শ্রমিকদের মজুরি প্রায় ৫০০ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতের শ্রমিকদের মজুরি গড়ে ৩৬০ শতাংশ বাড়িয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ এই মহামারী চলাকালীন দৈনিক আয় হারিয়েছে এমন ৫০ মিলিয়নের বেশি লোককে আমরা সরাসরি নগদ অর্থ এবং অন্যান্য সুবিধা প্রদান করেছি।’

বাংলাদেশী অভিবাসী কর্মীদের ব্যাপকহারে চাকুরি হারানো এবং এর ফলে রেমিটেন্সহ্রাস পাওয়ার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এসডিজি অর্জনে রেমিট্যান্স একটি মূল উপাদান হওয়ায় এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে এই চাকরিবিহীন শ্রমিকদের প্রত্যাবাসন এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসাবে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংক ভবিষ্যদ্বাণী করেছে যে, আমরা২০ শতাংশের বেশি রেমিট্যান্স আয় হারাব।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে আমরা আইএলওর শতবর্ষের ঘোষণার কথা স্মরণ করতে পারি, যেখানে আমরা সকলেই প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, জনসংখ্যা স্থানান্তর, জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্বায়নের মাধ্যমে আমাদের বিশ্বকে রূপান্তরিত করার প্রয়াসকে স্বীকৃতি দিয়েছিলাম।’

শেখ হাসিনা বলেন, জি-৭, জি -২০, ওইসিডি ও আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর সমর্থিত সকল পুনরুদ্ধার ব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকবে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। তিনি বলেন, ‘আমাদের চারপাশে যা কিছু ঘটছে, তা দেখেমনে হচ্ছে সবার জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি এককভাবে পূরণ করাকঠিন হবে। তবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, আমরা একযোগে এটি করতে পারবো।’

আইএলওর মহাপরিচালক গাই রাইডার এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানোম গেব্রেয়েসাস,এবং সুইজারল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, আয়ারল্যান্ড, ফিজি, থাইল্যান্ড, নেপাল, সামোয়া, পাকিস্তান, মিয়ানমার সহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানগণ, এবং ডব্লিউটিও’র ডিজি ও আইএমএফ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকঅন্যান্যের মধ্যে এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন।